Home / সম্পাদকীয় / আইপিও দুর্নীতি: আড়ালে ইস্যু ম্যানেজার

আইপিও দুর্নীতি: আড়ালে ইস্যু ম্যানেজার

এতোদিন বিতর্কিত আইপিও নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শুধু ডিসক্লোজ রিপোর্টের দোহাই দিয়ে আসছিল। যে কারণে বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টরা অনেকটা হতাশ হয়ে এ বিষয়ে কথা বলা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান কমিশনের প্রতি মানুষগুলো ফের আস্থা ফিরে পেতে শুরু করেছে। আইপিও’তে আসা কোম্পানিগুলোর অনিয়ম চিহ্নিত করে ডাইরেক্ট অ্যাকশন নেওয়ার মতো দু:সাহস এর আগে কোন কমিশন দেখায়নি। তাই বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে বেশ সাধুবাদ পাচ্ছে।

কিন্তু আইপিও দুর্নীতির পেছনে অন্যতম কারিগর যে ইস্যু ম্যানেজার সেটি আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বিএসইসি ইস্যু অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিসক্লোজ রিপোর্টের দোহাই দিয়ে বাঁচতে পারে কিন্তু ইস্যু ম্যানেজার তা পারে না। ইস্যু ম্যানেজারকে ফ্যাক্টরী ভিজিট করে সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে আইপিও’র জন্য প্রসপেক্টাস জমা দিতে হয়। ইস্যুয়ারের প্রসপেক্টাস যেভাবে সাজালে ইস্যুর অনুমোদন দ্রুত পাওয়া যায় তার কারিগর মূলত ইস্যু ম্যানেজারই। তাই ইস্যুয়ারের দায়ভার অবশ্যই ইস্যু ম্যানেজারকে নিতে হবে।

সম্প্রতি তুং হাই নিটিং এবং সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। কাট্টলি টেক্সটাইল জাল ব্যাংক স্টেটমেন্টে পুঁজিবাজারে এসেছে। সুহৃদ ইন্ডাষ্ট্রিজের পরিচালকদের শেয়ার জব্দ করা হয়েছে। অনিয়মের শাস্তি শুধুমাত্র কোম্পানিকেই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অনিয়ম করানোর পেছনে যে কলকাঠি নেড়েছে সেই ইস্যু ম্যানেজারকে আড়ালে সেভ করে রাখা হচ্ছে। এতে করে সামনে আরো বাজে বস্তা-পঁচা কোম্পানি আইপিও’তে আনার রাস্তা খোলা রাখা হয়েছে। এখানে বিএসইসি কিংবা ডিএসই’র কোন কর্মকর্তা জড়িত কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

তুংহাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজারে আনতে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে এএফসি ক্যাপিটাল এবং ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেড। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, কোম্পানিটি যে বছর তালিকাভুক্ত হয় সে বছরই ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়ে শেয়ার সংখ্যা আরো বাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে কোম্পানিটি কোন ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। অর্থাৎ কোম্পানির ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা কখনোই ছিল না যা ইস্যু ম্যানেজারের অজানা থাকার কথা নয়। আজ তুং হাই নিটিংয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাজার থেকে কোটি কোটি টাকা বের করার জন্যই এসব কর্মকান্ড করা হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

তুংহাই নিটিংয়ের তালিকাভুক্তির পরের বছরই পুঁজিবাজারে আসে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল। এ কোম্পানিরও ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে এএফসি ক্যাপিটাল এবং ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেড। ২০১৬ সালে সর্বশেষ ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়ার পর কোম্পানির আর খবর নেই। তালিকাভুক্তির দুই বছরের মাথায় কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ দেখানো হয়। বর্তমানে এর ফ্যাক্টরী ও অফিস সবই অস্তিত্বহীন অবস্থায় রয়েছে।

কাট্টলি টেক্সটাইল ২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এ কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। কিন্তু আইপিও আনার ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়। যার জন্য বিএসইসি কোম্পানির পরিচালকদের আর্থিক জরিমানা করেছে। কিন্তু এই ভুয়া তথ্য সরবরাহে সম্পূর্ণ মেকিং গেম যে ইস্যু ম্যানেজার করেছে তা আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।

আজ সুহৃদ ইন্ডাষ্ট্রিজের কোন খোঁজ-খবর নেই। ২০১৪ সালে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সুহৃদ। কিন্তু এরপরেই উৎপাদন বন্ধ, লোকসান আর নো ডিভিডেন্ডের ছয়লাব দেখা যায়। সুহৃদ ইন্ডাষ্ট্রিজের বছরের পর বছর বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করে পার পেয়ে গেলেও এবার কোম্পানিটিকে শাস্তির আওতায় এনেছে কমিশন। কিন্তু বাদ পড়ে গেছে সেই ইস্যু ম্যানেজার।

মূলত কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পেছনে রয়েছে প্লেসমেন্ট বাণিজ্য। ইস্যুয়ার ১৫-২০ বা ৩০ কোটি টাকার বাজার থেকে নিয়ে গেলেও প্লেসমেন্টহোল্ডাররা বানাচ্ছে অর্ধশত থেকে শত কোটি টাকা। এর এই গেম মেকিং করার জন্য ইস্যু ম্যানেজার বা বেনামে লোক জড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে।

তাই অনিয়মের শাস্তি শুধু ইস্যুয়ারকেই নয় ইস্যু ম্যানেজারকেও দিতে হবে। না হলে সামনে এসব দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা আইনের ফাঁক-ফোকড়ে নিজেদের ফায়দা হাসিল করেই যাবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এ বিষয়ে কঠিন অ্যাকশনে যাওয়া সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা আনয়নে শুধুমাত্র আইন দিয়ে নয় বরং গোড়ার সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান করতে হবে। তবেই এই কমিশনকে সাধারন মানুষ পরিপূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মনে করবে।

 

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/মাজ./নি

Check Also

জুনিয়র টাইগারের প্রতি অভিনন্দন

‘টাইগার’ শব্দের ব্যবহার বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমকে ‘টাইগার’ বা ‘টাইগার্স’ নামে অভিহিত করা হয়। এই সর্বনামের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *