Home / অন্যান্য / বন্ধ হচ্ছে কারিগরির মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স

বন্ধ হচ্ছে কারিগরির মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক:

কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরিচালিত মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং বিষয়ের কোর্সগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এ সংক্রান্ত সব প্রশিক্ষণ কোর্স স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হবে। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রইছ উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি এ সুপারিশ করেছে। দুই মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানি এবং সংশ্লিষ্টদের মামলায় জটিলতার কারণে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ঝুলেছিল এ বিষয়টি। অবশেষে এখন সিন্ধান্তটি বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, নিয়মবহির্ভূতভাবে মেডিকেল টেকনোলজি এবং নার্সিং কোর্স পরিচালনা নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই কমিটি গঠন করে। গত ১৯ নভেম্বর আট সদস্যবিশিষ্ট আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত সচিব রইছ উদ্দিনের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি ২ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। সেখানে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সব কোর্স স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- অতিরিক্ত সচিব (কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ), অতিরিক্ত সচিব (সিপিটি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়), অতিরিক্ত সচিব (স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ); উপসচিব (আইন ও বিচার বিভাগ), বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সচিব।
সুপারিশে বলা হয়, সুপ্রিমকোর্টের সিভিল পিটিশন লিভ টু আপিল নম্বর ২১৪৩/২০১৬ মামলার নির্দেশনা মোতাবেক মেডিকেল টেকনোলজি এবং নার্সিং সংক্রান্ত সব শিক্ষা কার্যক্রম ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট-এর আওতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত হবে।
কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের আওতাভুক্ত মেডিকেল টেকনোলজি এবং নার্সিং কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তালিকা প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন এবং পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ এবং নার্সিং কাউন্সিলে নিবন্ধন/অন্তর্ভুক্তিকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও কারিগরি শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক পরিচালিত মেডিকেল টেকনোলজি এবং নার্সিং কোর্সে নতুন করে ভর্তি ও নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) কার্যক্রম বন্ধ রাখতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সুপারিশে কারিগরি শিক্ষাবোর্ড আইন-২০১৮ সংশোধন করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উক্ত আইনের তফসিল ১ এর ক্রমিক ‘ঞ’ ও ক্রমিক নং ৪ সহ উক্ত তফসিলে উল্লিখিত মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ কোর্স সংক্রান্ত বিধানাবলি ৩০ দিনের মধ্যে বিলুপ্ত/সংশোধন করতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি মনে করে, কারিগরি শিক্ষাবোর্ড আইন-২০১৮-এর উল্লিখিত তফসিল সংশোধন করা হলে আদালতের প্রদত্ত রায়ে উল্লিখিত ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।
আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কার্যক্রম মনিটরিং করতে অতিরিক্ত সচিব (কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ); অতিরিক্ত সচিব (স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ), বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার, সংশ্লিষ্ট সিনিয়র সহকারী সচিব/উপসচিব (স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ) এর সমন্বয়ে ৫ সদস্যের একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কারিগরি বোর্ডের মাধ্যমে ৯৪ টি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক বছর যাবত শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। ইতিমধ্যেই সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে চার হাজারেরও বেশি নার্স পাস করে বের হয়েছে। আরো প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে কিংবা ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছে।
জানা গেছে, ১৯৬২ সন হইতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালিত হয়ে আসছিলো। ২০০৫ সালে কারিগরি শিক্ষাবোর্ড মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনা শুরু করলে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়। জটিলতা নিরসনকল্পে ২০০৭ সালে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটি মেডিকেল টেকনোলাজি ও নার্সিং কোর্স স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট এর আওতায় পরিচালনার জন্য সুপারিশ করে। দীর্ঘ ১২ বছরেও উক্ত সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং কারিগরি শিক্ষাবোর্ড মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনা অব্যাহত রাখায় জটিলতা আরও বৃদ্ধি পায়। এরইমধ্যে ২০১৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদফতর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করলে কারিগরি শিক্ষাবোর্ড থেকে পাশ কৃতরা হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন।
ফলে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে মামলাটি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে স্থানান্তরিত হলে আপিল বিভাগ ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশের আলোকে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের উক্ত নির্দেশনা ৩ বছরেও বাস্তবায়িত না হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হয়, যা আগামী ৫ জানুয়ারি শুনানি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত নভেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি সুপারিশ করেছে। এটি অবশ্যই একটি ভালো সংবাদ। এখন এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতর সব কোর্স পরিচালনা করে রোগীদের কথা বিবেচনা করে। কিন্তু কারিগরি বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত কোর্সগুলো হয়তো সেরকম করতে পারে না। তাই ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট যত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে ততই মঙ্গল। দীর্ষ ১২ বছর সিন্ধান্তটি ঝুলে না থাকলে নাসিং খাতে যে জটিলতাগুলো সৃষ্টি হয়েছিল তা হতো না।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়েরকারী বেকার এন্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট ৩ বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কারিগরির মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোসের অধীনে বেশ কিছুু জটিলতা তৈরি হয়। ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে এইচএসসি ব্যাকগ্রাউন্ড, জিপিএ, বয়স, সেশন, জেলা কোটা ও পুরুষ-মহিলা কোটা বিবেচনা করলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে এর কোনোটাই নেই। শুধুমাত্র এসএসসি বা সমমান পাসের যে কেউ ভর্তি হতে পারে। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের ক্ষেত্রে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নার্সিং স্টুডেন্ট ভর্তির ব্যবস্থা থাকলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতি নেই। এ নিয়ে প্রতিবাদ করে আসছিলো নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের ক্ষেত্রে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের অধিভুক্ত সব প্রতিষ্ঠান নার্সিং শিক্ষকম-লী দ্বারা পরিচালিত। শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষ থেকেই হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস (ব্যবহারিক শিক্ষা) বাধ্যতামূলক হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে তা নেই। কাউন্সিল কর্তৃক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মেডিকেল ও নার্সিং বিশেষজ্ঞসহ স্টেকহোল্ডার সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক এবং ডাব্লিউএইচও ইউএনএফপিএ এর বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের নার্সিং কারিকুলামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থাৎ প্রার্থীর ভর্তির যোগ্যতা কোর্সের শিরোনাম বিষয়সমূহ ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক পাঠদানের সময় বণ্টন কোর্সের মেয়াদ ও পূর্ণমান পাস নম্বর নির্ধারণ করা হলেও কারিগরি বোর্ডের ক্ষেত্রে এসব কিছুই অনুসরণ করা হয়নি।
এমনকি কারিগরি বোর্ডে কোন মেডিকেল বিশেষজ্ঞ বা নার্সিং বিশেষজ্ঞ দ্বারা কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন বা পরিচালনা করা হয় না। মেডিকেল বা নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেমন প্রকৌশলী বা স্থপতিদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালন করা যায় না তেমনি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও চিকিৎসা শিক্ষা বা নার্সিং শিক্ষা পরিচালনা নৈতিকতা বিরোধী। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের কোর্সের নাম ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সাইন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে এ নামে কোনো কোর্স নেই। তাই সব কিছু বিবেচনা করে এমন সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

Check Also

কৃষকদের জন্য ইউপি মেম্বার মানিকের ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে যে কৃষকরা শ্রম দিয়ে মাঠে ফসল ফলান তাদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *